কমলাকান্তের পুনরুত্থান: শেষ পর্ব

image-কমলাকান্তের পুনরুত্থান: শেষ পর্ব
মার্জার কমলাকান্তের প্রতি কটাক্ষ করিয়া কহিল, “কি সকল ছাঁইপাশ লেখা হইতেছে তোমাকে লইয়া, সেই খবর কি রাখিয়া থাক? রচনার মাথা নাই, মুন্ডু নাই, ভাষার কোন গাঁথুনি নাই, সাধু চলিত মিলিয়া একাকার করিয়া রাজনীতি অর্থনীতি সমাজনীতি মিশাইয়া কি অর্থহীন খিচুরি হইতেছে তাহা লইয়া তোমার কোন আক্ষেপই দেখি না। কোথাকার কোন বুলগেরিয়ার মন্ত্রী পদত্যাগ করিল, কোথায় কোন শ্বেত ইউরোপীয় বর্ণবাদী হইয়া উঠিল, কোথায় কোন দরিদ্র দেশে স্বৈরতন্ত্র জাঁকিয়া বসিল, ইহা লইয়াই দেখি তোমার চিন্তার সীমা নাই। একাকী থাকিলে কেহ নিজের প্রতি নজর দেয় না জানি, তোমার তিনকুলে কেহ নাই ইহাও অবগত আছি, তাহা বলিয়া এরূপ অযত্নের চূড়ান্ত হইবে তাহারতো মানিতে পারি না। বঙ্গদেশে গঞ্জিকাসেবী হইলেও পুরুষ পুরুষই, তুমি রাজি থাকিলে আমি আমার দুই চারিটি মার্জার বন্ধুর নিকট কথা বলিয়া দেখিতে পারি, তাহারা কোন বিবাহযোগ্যা কন্যার পোষ্য কিনা। সকল প্রকার মতিভ্রমের ঔষধ হিসাবে যাহা শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরিয়া বাঙ্গাল সমাজে চলিয়া আসিতেছে, তাহাকে নিতান্ত শেষ চেষ্টা হিসাবেও প্রয়োগ করিতে আমার আপত্তি নাই। সেই বঙ্কিম যুগ থাকিয়া তোমাকে এইরূপ দেখিয়া আসিতেছি, আফিস ছাড়িয়া গাঁজা ধরিলে দেখিলাম, এরপর কি ধরিবে? মদ ধরিলে হয়ত আমার আত্মা শান্তি পাইত, তোমার স্বর্গত পিতামাতাও অখুশি হইতেন বলিয়া মনে হইত না, কিন্ত কোকেন হিরোইন ইয়াবা শুরু করিলে তো আমায় এখান হইতে বিদায় লইতে হয়।“ মার্জারের কোন কথা কমলাকান্তের মনে ধরুক বা না ধরুক, কোকেনের কথা শুনিতেই তাহার মস্তিষ্কে নতুন ভাবনা জাঁকিয়া উঠিল। এক আধবার আস্বাদন করিয়া দেখিলে ক্ষতি কি? গৃহিনী আনার প্রস্তাবটি মন্দ নয় বটে, তবে কমলাকান্ত বরাবরই নারী সঙ্গ এড়াইয়া চলে। নারীরা ভগিনী হিসাবে মন্দ নহে, মাতা হিসাবে অতি উত্তম, কন্যা হিসাবে পরম আদরণীয়, কিন্তু প্রেয়সীর প্রশ্ন আসিলেই যেন ছুটিয়া পলাইয়া যাইতে মন চায়, তী্ব আকর্ষণে বাঁধা পড়িয়া কষ্টরপাইবার বদলে আকর্ষণে না জড়াইয়া পড়াই অধিকতর শ্রেয় মনে হয়। যে নারীর টানে জাগতিক সকল বিষয় অর্থহীন মনে হয়, জীবিকার তাড়না থাকিয়া শুরু করিয়া ফ্রান্সের প্রেসিডন্ট নির্বাচন পর্যন্ত রসহীন মনে হয়, যে নারীর টানে ব্যক্তিত্ব ধুলায় লুটাইয়া পড়ে, বাঁধ ভাঙ্গিয়া যায়, বর্ম খুলিয়া যায়, সেই নারীর টানের বিন্দুমাত্র সম্ভাবনা দেখিলে কমলাকান্তের ইচ্ছা হয় ছুটিয়া পলাইতে। পলায়নে কমলাকান্ত স্বার্থক হউক বা না হউক, আফিম গঞ্জিকা আর সব নব্য নেশায় নিজেকে ভাসাইয়া দিয়া যে নারী হইতে দূরে সুখে শান্তিতে নিজের বাকি জীবন কাটাইয়া দিতে পারিবে, সেই ব্যাপারে কমলাকান্তের কোন সন্দেহ নাই। কেহ উঁকি দিতে চাহিলেও দরজা বন্ধ দেখিবে, ঠিকানা ভুল শুনিবে, দুরালাপনীতে উত্তর পাইবে না। এই না পাওয়ার মাঝে হয়তো নারীক্বের পূর্ণতা লুকাইয়া নাই, কমলাকান্তের পৌরষের পূর্ণতাও লুকাইয়া নাই, যাহা লুকাইয়া আছে তাহা হইতেছে কমলাকান্তের কমলাকান্ত হইবার মূল গল্প, মূল মন্ত্র। সকল বিস্তৃত ব্যাপারের ন্যায় ইহার পশ্চাতেও বিশাল ইতিহাস রহিয়াছে, তাহা হয়ত কোনদিন কেহ জানিবে না, তবে কমলাকান্ত নতুন কোন গল্পের উপলক্ষ্য তৈরি করিতে উৎসাহিত নহে। তাহাতে জীবন ধ্বংস হয় তো হইয়া যাক, আধভাঙ্গা ফুসফুস, চর্বিদার হৃদপিন্ড আর ভগ্নপ্রায় লিভার লইয়া বঙ্কিম যুগ হইতে আজ পর্যন্ত বাঁচিয়া আছে যেহেতু, বাকি দিনও বাঁচিয়া থাকিবে। বাঁচিয়া না থাকিলেও কিছু যায় আসিবে বলিয়া মনে হয়না হয়ত, পৃথিবীতে কোন কিছু কাহারও জন্য থামিয়া থাকে না, বরঞ্চ কমলাকান্ত এই তীব্র দহন হইতে বাঁচিয়া যায়। অস্তিত্বের চাইতে বড় দুঃখ আর পৃথিবীতে নাই, অস্তিত্বহীনতার চাইতে বড় সুখও কোথাও নাই, ইহার নিমিত্তেই হয়ত কমলাকান্ত বড়সড় ব্যাপার লইয়া ভাবিয়া নিজেকে ব্যস্ত রাখিবার চেষ্টা করিয়া থাকে। তাহা একেবারে সাফল্যের চূড়ায় উঠিয়া যায় বলিয়া সে কখনও দাবী করে নাই, তবে তাহা কমলাকান্তকে বাঁচাইয়া রাখর বটে। এইরূপ সাতপাঁচ ভাবিতে ভাবিতে গঞ্জিকার ঘোরে কমলকান্ত নিজের অজান্তেই বলিয়া উঠিল, “ম্যাও”। দীর্ঘ নীরবতার পর এইরূপ ম্যাও শুনিয়া মার্জার হতবাক হইয়া কিছুক্ষণ চাহিয়া রহিল। এরপর ধীরপদে মাথা নাড়াইতে নাড়াইতে প্রস্থান করিল। তাহাতে রাগ-ক্ষোভ-ঘৃণা নাকি অবজ্ঞা ছিল বলিতে পারি না, তবে মার্জার যে আর ফিরিবে না তাহা তার দুলুনি দেখিয়াই বোঝা যাইতেছিল। আহা, কমলাকান্তও যদি এইরূপ আর না ফিরিতে পারিত!
 
 
Comments • 0